উপমহাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লা। বাংলা, উর্দু, হিন্দী, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, গুজরাটি, ফার্সি, আরবি, ইংরেজি, স্প্যানিশসহ ১৮টি ভাষায় তাঁর কণ্ঠের জাদুতে তিনি গেয়েছেন ১০ হাজারেরও বেশি গান। প্রায় ছয় দশকের দীর্ঘ সংগীত জীবনে তিনি অর্জন করেছেন অসংখ্য পুরস্কার, যার মধ্যে বাংলাদেশের ৭ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার, এবং পাকিস্তানের নিগার পুরস্কার ও ভারতের সায়গল পুরস্কার উল্লেখযোগ্য। তিনি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসেও নাম লেখান।
🌟 জন্ম, শৈশব ও গানের শুরু
• জন্ম: ১৭ নভেম্বর ১৯৫২, সিলেট, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)।
• পরিবার: বাবা সৈয়দ মোহাম্মদ এমদাদ আলী ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা এবং মা আনিতা সেন (আমেনা লায়লা) ছিলেন সংগীত শিল্পী। তাঁর মামা সুবীর সেন ছিলেন ভারতের বিখ্যাত সংগীত শিল্পী।
• শৈশব: বাবার চাকরির সূত্রে তাঁর আড়াই বছর বয়সে তারা তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের মুলতানে চলে যান এবং তাঁর শৈশব কাটে লাহোরে। সেখানে তিনি ওস্তাদ হাবিব উদ্দিন খান ও পণ্ডিত গোলাম কাদিরের (মেহেদি হাসানের ভাই) কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীত ও গজলের দীক্ষা নেন।
• প্রথম গান: মাত্র ৬ বছর বয়সে তিনি প্রথম মঞ্চে গান পরিবেশন করেন। তবে, তাঁর সংগীতাঙ্গনে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৪ সালে উর্দু চলচ্চিত্র ‘জুগনু’-তে “গুড়িয়া সি মুন্নি মেরি ভাইয়া কি পেয়ারি” গানটি দিয়ে।
🎼 কর্মজীবনের বাঁক ও খ্যাতি
• প্লেব্যাক শুরু (পাকিস্তান): ১৯৬৫ সালে তিনি পাকিস্তানি চলচ্চিত্রে নিয়মিতভাবে প্লেব্যাক শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে উর্দু ভাষার ‘হাম দোনো’ ছবিতে “উনকি নাজরোঁ সে মোহাব্বত কা জো পয়গম মিলা” গানটি তাকে পরিচিতি এনে দেয়। ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’ গানটি তাঁকে ভারতজুড়ে বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দেয় এবং তিনি ‘দামদাম গার্ল’ নামে পরিচিতি পান।
• বাংলাদেশে ফেরা ও প্রথম প্লেব্যাক: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে তিনি সপরিবারে দেশে ফিরে আসেন। বাংলাদেশে তাঁর প্রথম প্লেব্যাক করা গানটি হলো প্রয়াত সত্য সাহার সুরে ‘জীবন সাথী’ চলচ্চিত্রের। এরপর তিনি এদেশের চলচ্চিত্র, পপ ও আধুনিক সংগীতে অপরিহার্য হয়ে ওঠেন।
• গিনেস বুক রেকর্ড: সুরকার নিসার বাজমির ১০টি করে মোট তিন দিনে ৩০টি গান রেকর্ড করে তিনি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখান।
• অভিনয়: তিনি চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘শিল্পী’ নামক চলচ্চিত্রে চিত্রনায়ক আলমগীরের বিপরীতে অভিনয়ও করেছেন।
🌏 ১৮টি ভাষায় ১০ হাজারেরও বেশি গান
রুনা লায়লা শুধুমাত্র একজন গায়িকা নন, তিনি একজন বহুভাষিক শিল্পী। তাঁর বৈচিত্র্যময় কণ্ঠের কারণেই তিনি বহু ভাষায় গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
১৮টি ভাষায় ১০,০০০+গান খেয়েছেন ,উল্লেখযোগ্য ভাষাসমূহ
বাংলা, উর্দু, হিন্দি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, গুজরাটি, বেলুচি, পশতু, ফার্সি, আরবি, মালয়, নেপালি, জাপানি, স্পেনীয়, ফরাসি, লাতিন ও
ব্যক্তিগত জীবন ও সংসার
রুনা লায়লা তিনবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
• প্রথম বিয়ে: খাজা জাভেদ কায়সারের সঙ্গে।
• দ্বিতীয় বিয়ে: সুইস নাগরিক রন ড্যানিয়েলের সঙ্গে।
• বর্তমান সংসার: ১৯৯৯ সালে তিনি জনপ্রিয় বাংলাদেশি অভিনেতা আলমগীরের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
তিনি তানি লায়লা নামে এক কন্যার জননী। এছাড়া তাঁর দুই নাতি জাইন এবং অ্যারন রয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়েও তাঁর সংগীতের পথচলা কখনও থেমে থাকেনি।
আজও কিংবদন্তি এই শিল্পী দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গেয়ে চলেছেন এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে আছেন।